অসমাপ্ত আত্মজীবনী রিভিউ প্রতিযোগ-২০১৬ (৩য় পুরস্কার বিজয়ী)

0

2

অসমাপ্ত আত্মজীবনী রিভিউ প্রতিযোগ-২০১৬ (৩য় পুরস্কার বিজয়ী)

  • 0
  • #বই রিভিউ
  • Author: Zahid Hasan
  • Share

অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ : নিরপেক্ষতার মৌলিক দলিল – nazia ferdoush

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ : নিরপেক্ষতার মৌলিক দলিল ‘তিনি কখনো আপোস করেন নাই। ফাঁসির দড়িকেও ভয় করেন নাই। তাঁর জীবনে জনগণই ছিল অন্তঃপ্রাণ।’ তাঁর সম্পর্কে এমনই মত পোষণ করেছেন তাঁর সুযোগ্যা কন্যা। পিতা শেখ লুৎফর রহমানের সততা ও সচেতনতার বাণীকে মর্মে ধারণ করে পথচলা শুরু করেছিলেন তিনি। তাঁর সর্বংসহা সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুন্নেছার ‘বসেই তো আছ , লেখ তোমার জীবনের কাহিনী’ এই অনুরোধে যিনি বলেছিলেন ‘…এমন কি করেছি যা লেখা যায়!…নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ ¯স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।’ তিনিই রচনা করেছেন অসাধারণ এক জীবনী সাহিত্য ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫)। এ শুধু একটি আত্মজীবনী নয় বাঙালী জাতির ইতিহাসের একিটি অসাধারণ সাহিত্যিক প্রকাশও বটে। ১৯৬৭ সালে রচিত হলেও বইটি প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দীর্ঘ সময় পর (২০০০-২০১২) এই অসমাপ্ত আত্মজীবনী একটি অসাধারণ জীবনীসাহিত্য হিসেবে প্রস্ফুটিত হয়। সাধারণ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থগুলোতে নিজের মহিমা প্রচারের ও নিজ কৃতিত্বকে তুলে ধরার যে সচেতন প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় এই গ্রন্থটি তা থেকে সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রম ধারায় রচিত। একজন অসাধারণ নিরপেক্ষ প্রকৃত দেশপ্রেমিকের হাতেই এ অনন্য সাহিত্যের নির্মাণ সম্ভব। এ বই যে পড়বে নিরপেক্ষতার পরাকাষ্ঠায় তাকে স্বীকার করতেই হবে এর অনন্যতা। এ যেন জীবনী গ্রন্থ নয়, বইটি পড়লে কখনো মনে হবে একটি অসাধারণ গল্পের বই, কখনো মনে হবে বাংলার ইতিহাস যেন কোন সাহিত্যিক সাবলীল ভাষায় নিজের মত করে বয়ান করছেন যার কোথাও কোন পক্ষপাতিত্ব নেই, নেই কিছু লুকোবার প্রয়াস। ১৯৩৪ থেকে শুরু করে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার আলোকপাত রয়েছে বইটিতে। গ্রন্থের শুরুটা ঠিক উপন্যাসের মত। গ্রামের শেখ বংশের একটি ছেলে বর্ণনা দিচ্ছে তার বংশের, তারপর মাত্র ১২বছরে বাল্য বিবাহের কাহিনিও বলে গেছে অবলীলায়। ১৯৩৬ সালে এই বালকটি প্রথম রাজনীতিতে পা রেখেছিল সুভাষ বসুর ভক্ত হয়ে। তবে সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে। তাঁকেই লেখক সব সময় আদর্শের স্থানে রেখেছিলেন। বয়স খুব কম হলেও ছেলেটির সাহস ছিল প্রচণ্ড, বন্ধুকে রক্ষায় যে বলতে পারতো-‘ওকে ছেড়ে দিতে হবে, নইলে কেড়ে নেব’। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই প্রথম জেল খাটতে হয় তাঁকে। বাবার সততা ও নিষ্ঠার আদর্শকে সারাজীবন মান্য করে গেছে ছেলেটি। অসাধারণ সব সংগ্রামে পার করেছে ১৯৪৩, ১৯৪৭, ১৯৫২,১৯৭১। মানুষের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রমে অতিবাহিত হয়েছে তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত। মানুষের জন্য, দেশের জন্য তিনি ঘুমিয়েছেন চাকরদের কামরায়, থেকেছেন বেকার হোস্টেলে অর্ধাহারে অনাহারে। তবুও হাল ছাড়েন নি কোনোভাবে।। সাম্প্রদায়িকতা তিনি পছন্দ করতেন না মোটেও, বরং হিন্দু-মুসলিম সকলকে এক করতে ছিলেন বদ্ধপরিকর। কোটারির বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন তিনি। তোষামোদি করতে মোটেও পছন্দ করতেন না, পছন্দ করতেন না আপোষ করতেও। অসীম সাহসীকতায় তাই সোহরাওয়ার্দীকেও তিনি বলতে পেরেছিলেন-‘আপোস করার কোন অধিকার আপনার নাই। আমরা খাজাদের সাথে আপোষ করবো না।’ বইটি পড়তে পড়তে মনে হবে ঠিক যেন অর্ধশত বছর আগের কোন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাত্রা করছি আমরা। ঘটনাপুঞ্জ এমনি নিরেট যে এর কোথাও কোন ফাঁক নেই, দম ফেলার অবসর নেই। অসাধরণ বয়ান ভঙ্গি আর সাবলীল উপস্থাপন, তরতর করে টেনে নিয়ে চলে একেবারে গ্রন্থের শেষ পর্যন্ত। এ গ্রন্থের পরতে পরতে চমক আর সরলতা, বন্ধুত্ব আর সততা, ত্যাগ আর সংগ্রামের নজির। সাথে রয়েছে বিদেশ ভ্রমণের চাঞ্চল্যকর বর্ণণা যা এনে দেয় অসাধারণ ভ্রমণ গ্রন্থের স্বাদ। শুধু দেশের রাজনীতির আগাগোড়া বর্ণনাই নয় এতে তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর মনোভাবও, একজন সুদক্ষ ঔপন্যাসিক যেমন করে নিজের মতকে মিলিয়ে দেন লেখার সাথে ঠিক তেমনি। অনেক ক্ষেত্রে করেছেন উপযুক্ত তুলনাও- ‘এরা শিল্পকারখানা বানানোর জন্যই শুধু বৈদেশিক মুদ্রা ব্যায় করে। আমাদের দেশে সেই সময় কোরিয়ার যুদ্ধের ফল¯^রূপ যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছিল তার অধিকাংশই ব্যয় হল জাপানি পুতুল, আর শৌখিন দ্রব্য কিনতে। দৃষ্টিভঙ্গির কত তফাৎ আমাদের সরকার আর চীন সরকারের মধ্যে।’ এই অসাধারণ উপলব্ধি অনেক আগেই করতে পেরেছিলেন তিনি যা আজও আমরা অনেক ক্ষেত্রেই করতে শিখিনি। দেশকে এই মহান পুরুষ প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। নেতার অহংকার তাঁর ছিল না বলেই তিনি বলতে পারতেন-‘কোন নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তার প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগনের আছে।’ একজন নিরপেক্ষ আদর্শ নেতার মুখেই এ বচন শোভা পায়। ১৯৫৫ পর্যন্ত তিনি লিখতে পেরেছিলেন এক অসাধারণ ইতিহাস এরপর আরো অনেক চড়াই উৎরাই তিনি পার করছেন কিন্তু সময়ের অভাবে তা লিপিবদ্ধ করার সুযোগ তাঁর ঘটেনি, ফলে তাঁর ও এদেশের জাতীর জীবনের অমূল্য ইতিহাস অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ই একটি উপযুক্ত শিরোনাম। <br>জীবন মানেই সাহিত্য। তবে সব রচনা সাহিত্যের মানদণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম হয় না। অসাধারণ আত্মজীবনীও উন্নত সাহিত্যের মর্যাদা পেতে পারে যদি তা হয় সহজ অথচ মর্মস্পর্শি, সাধারণ হয়েও অসাধারণ। যদি তা হয় বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র অনুরূপ। সত্যিই এ এক অমূল্য, অসাধারণ গ্রন্থ। যে কোটারি আর দুর্নীতির দায়ে আমরা আজ কলঙ্কিত, যে তোষামুদে রাজনীতির ফাঁদে আমরা আজ জর্জরিত তা কোনদিন কাম্য ছিল না তাঁর। কোটারি আর পক্ষপাতহীন সমাজ চেয়েছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন সকল ধর্মের, সকল সম্প্রদায়ের মানুষের যাদের তিনি ভাই বলে জানতেন। রাজনীতিকেও এত নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বয়ান করা কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল। এই গ্রন্থটিতে তাঁর প্রতিটি বিবৃতি সেই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচায়ক। তিনি প্রকৃত অর্থে কোন দলের নন, নন বিশেষ কোন শ্রেণীর। তিনি সারা বাংলার মানুষের, তিনি দল মত নির্বিশেষে সবার যার স্পষ্ট নজির তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। একজন আদর্শ দেশনায়ক, আদর্শ দেশপ্রেমীকের চিহ্ন বহন করে চলেছে এই ছোট্ট গ্রন্থটি। আমাদের তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যৎ কাণ্ডারীদের জন্য এটি কেবল একটি অনুসরণীয় আদর্শই নয় ইতিহাসের প্রতীকও। নয় শুুধু সংগ্রামী জীবনের একটি উজ্জ¦ল দৃষ্টান্ত, এটি নিরপেক্ষতার মৌলিক দলিলও

 

নাজিয়া ফেরদৌস

বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Write a Comment