তুমি যেমন করে লেখো হে গুণী- বাবাকে নিয়ে লেখা

0

8

তুমি যেমন করে লেখো হে গুণী- বাবাকে নিয়ে লেখা

  • 0
  • #লেখক কুঞ্জ
  • Author: Zahid Hasan
  • Share

বাবা দিবসে বাবাকে নিয়ে জনপ্রিয় গল্পকার কিঙ্কর আহসানের লেখাঃ

কোলাহলের কারাগারঃ

অনেক জোড়াতালির পর বাড়িটা দাঁড়িয়েছে মাত্র। জানালাগুলো অমসৃণ কাঠে ঢেকে দেওয়া। ইটের শরীরজুড়ে কাঁচা সিমেন্টের ঘ্রাণ। সদর দরজার পাশে ভাঙা সুরকি, বালু। এ আমাদের নতুন সংসার। আমি আর বাবা। ঘুম ভাঙলেই মাখনভর্তি বাটারবন আর তিতকুটে রং-চা। চোখে পিচুটি নিয়ে চালবাছা দেখি। আমার হাসি পায়। মাকে দেখেছি এসব কাজ করতে। পুরুষমানুষের কি এসব মানায়! মা দেখলে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসত আর বলত, ‘এভাবে আর কদ্দিন। বিয়ে করো আরেকটা।’

প্রতিদিনই অঘটন। মাছ কুটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলে। মুরগির ঝোল পাতিলেই উবে যায়। নুন বেশি পড়ে তরকারিতে। প্রতিদিন বাঁধাধরা এক খাবার—ডিমভাজি। শরীর থেকে ডিম-ডিম গন্ধ পাই।

সূর্য রোদের শামিয়ানা পাতার আগেই বাবা দুম করে উধাও। অফিস। দিনভর কী এক জঘন্য কাজ করে কে জানে! ভাল্লাগে না। মনজুড়ে আমার আকুলি-বিকুলি, ক্লাস? সে তো সেই দুপুরে। কী করি আমি। তোপখানা রোডে আমাদের বাড়ি। ধারদেনা করে মাথা গোঁজার এ ঠাঁইটুকু পেয়েছে বাবা। বরিশালের পাট চুকিয়ে মায়ের এখানে আসতে ঢের দেরি।

মধ্যবিত্তের তৃপ্তি সামান্যতেই। বাবা আজকাল বাবুইপাখি হয়ে গেছে। কাজ শেষ হতে না হতেই তার আসা চাই এ ভাঙা প্রাসাদে। হোক না সে বাসার কল থেকে টিপ টিপ করে জল ঝরে সারাক্ষণ, হোক না তার জানালার ফাঁক গলে হু হু করে ঢোকে শহুরে কোলাহল।

মাঝেমধ্যে ঘরে তালা দিয়ে বের হয়ে যাই। অচেনা শহর। নোংরা, আঁশটে। দম বন্ধ হয়ে আসে। পরিচয়ের শুরুতেই পর করে দেয়। এ শহর আমার নয়। একদম না। আমি শামুক হয়ে যাই। নগরের কনিষ্ঠ শামুক। আমার মনের পরতে পরতে লজ্জা। খোলসে মুখ লুকিয়ে রাখি সব সময়। সচিবালয়ের সামনের দেয়ালে ঠাসা পেপারগুলো পড়ি। মুখস্থ হয়ে যায় কালো অক্ষরগুলো।

বাবা জানলে বলত, ‘পড়ার বই মুখস্থ হয় না তোমার। আর এগুলো…। সব ঠোঁটস্থ ছিল আমার। পরীক্ষায় ফার্স্ট হতাম।’ আচ্ছা, সব বাবাই কি ফার্স্ট হন! সবার মুখে যে একই কথা। এখানে মাঠ নেই। নেই পুকুর। আছে শুধু অজস্র রিকশা আর গাড়ির বহর। ফুটপাতজুড়ে নোংরা পত্রিকা বিক্রি করা মানুষ। ঝালমুড়ি, ভেলপুরি, শিককাবাবের পোড়া লাল-খয়েরি রং মেশানো মাংস। টাইপ রাইটারের কুৎসিত খটাখট শব্দ। ভয় হয়। ওলটপালট সব। শান্তি নেই ইশকুলেও। দৌড়ে ফিরি বাড়ি। বাড়িতে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে কংক্রিটের দেয়ালগুলো। কত কথা ওদের সঙ্গে। না বলতে পারলে তো পেট ফেটেই মারা যাব। দে দৌড়!

বাবা রাত জাগতে পারে না। পাশে শুয়ে নাক ডাকে। শরীরে তার লেপটে আছে শুকনো ঘাম। বাবুইপাখিটা বড় ক্লান্ত। আমি একা পড়ে থাকি বিছানায়। বড্ড একা। একটা সময় কোলবালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠি। বলি, ‘ও বাবা, আমায় একটা মাঠ দাও, ঘুড়ি ওড়াব। দাও পুকুর, হাত-পা মেলে জল কেটে সাঁতার কাটব। মাছেদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেব। এ কোলাহলের কারাগারে থাকব না আর। একটা সেকেন্ডও না।’বাবা ঘুমে কাদা। শোনার সময় কই তার!

____________________________________________________

এক নজরে কিঙ্কর আহসানঃ

দেশের একটি জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকায় লেখালেখির শুরু। টানা পাঁচ বছর বাংলানিউজ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, পরিবর্তনসহ দেশের প্রায় সব শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে লিখেছেন ছোটগল্প। কালের কণ্ঠের ‘বাতিঘর’ পাতায় শিক্ষানবিস সাব এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন।

লেখালেখির পাশে হাত পাকিয়েছেন ফিল্মেও। ‘পাতার নৌকা’, ‘ক্রিং ক্রিং’ ও ‘জলপরানি’ টেলিফিল্মের কাজ করে হয়েছেন প্রশংসিত। ‘কে হতে চায় কোটিপতি’ টিভি শো’র সহকারী স্ক্রিপ্ট রাইটারের কাজ করেছেন। এছাড়া ‘মার্কস অলরাউন্ডার’, ‘হাসতে মানা’, ‘হান্ডসাম দি আলটিমেট ম্যান পাওয়ার্ড বাই বাংলাদেশ নেভী’ ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সুপার লীগ-গ্রান্ড লোগো আনভেইলিং’র প্রধান স্ক্রিপ্ট রাইটার ছিলেন।

কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লেখক সংঘ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ, কণ্ঠশীলন, মুক্তআসর, বিল্ড বেটার বাংলাদেশসহ আরও অনেকগুলো সংগঠনের সাথে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সঙ্গে ডকুমেন্টারি নির্মাণসহ আরও নানান কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। চ্যানেল আইয়ের ‘আই পজিটিভ কমিউনিকেশন’-এ অ্যাসোসিয়েট গ্রুপ হেড হিসেবে কর্মরত ছিলেন দুই বছর। বর্তমানে কাজ করছেন ‘সান কমিউনিকেশন’ নামে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায়। সবকিছুর পরেও লেখালেখিই কিঙ্কর আহ্সানের আসল জায়গা। তার সর্ম্পকে এক কথায় বলতে গেলে তার বুবুর কাছ থেকে শোনা কথাটাই বলতে হবে, ‘মাটির মানুষ ছেলেটা তবুও আকাশে ডানা মেলে ওড়ার আজন্ম সাধ তার।’

এ পর্যন্ত ছয়টি বই লিখেছেন তিনি। বইমেলায় প্রকাশিত তার পাঠকপ্রিয় বইগুলো হলো- আঙ্গারধানি (উপন্যাস), কাঠের শরীর (গল্পগ্রন্থ), রঙিলা কিতাব (উপন্যাস), স্বর্ণভূমি (গল্পগ্রন্থ), মকবরা (উপন্যাস) ও আলাদিন জিন্দাবাদ (গল্পগ্রন্থ)

Write a Comment