বাবাকে নিয়ে লেখা- একুয়া রেজিয়া

0

4

বাবাকে নিয়ে লেখা- একুয়া রেজিয়া

  • 0
  • #লেখক কুঞ্জ
  • Author: Zahid Hasan
  • Share

……………………………

তাঁকে খুঁজি

আমার আব্বু মারা যান যখন আমার বয়স দুই কি আড়াই বছর।

কেউ মারা যাওয়ার কিংবা কেউ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার বেদনা বোঝার তখন আমার কোনই বয়স হয় নি। আমার তাই আব্বুর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে কোন তীব্র বেদনা কাজ করে না। যা কাজ করে তা হল শূন্যতা। অপার সমুদ্রের মতো থৈ থৈ শূন্যতা। এই শূন্যতার কোন শেষ নেই।

আমি স্কুলে পড়ার সময় ভাবতাম, পৃথিবীর লক্ষ কোটি মানুষের ভীড়ে আমার আব্বু হারিয়ে গেছেন। আমি একদিন হঠাৎ করে ভীড়ের মাঝে উনাকে খুঁজে পাবো। উনাকে পেয়ে চমকে যাবো। “আব্বু” বলে ডেকে আনন্দ আর দুঃখে হু হু করে কেঁদে ফেলবো। জীবন কোন গল্প, সিনেমা কিংবা উপন্যাস নয় বলে এমন কিছুই আমার সাথে হয় নি। আমার বুঝতে বিস্তর সময় লেগেছে মেঘের ওপারে হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা ফিরে আসে না কখনওই।

আব্বু মারা যাবার পর আম্মু এতই মানসিকভাবে ভেঙে গিয়েছিলেন যে আমি বড় হয়েছি বলতে গেলে অনেকটাই একা একা। এখন আমার আম্মু মাঝে মাঝেই কান্নাকাটি করেন। আমি সেই আড়াই বছর বয়স পেরিয়ে কবে যে এতো বড় হয়ে গেলাম উনি নাকি সেটার হিসেব মিলাতে পারেন না। লুকিয়ে লুকিয়ে তখন নিঃশব্দে আমিও কাঁদি। কারণ আমিও মনে করতে পারি না অনেক কিছুই। বুঝতে পারি না একজন মানুষ কীভাবে এতগুলো বছর তাঁর হারিয়ে যাওয়া স্বামীর স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে তিল তিল করে বেঁচে থাকে। কিংবা বুঝতে পারি না আম্মু কবে থেকে আমার মা থেকে বান্ধবী হলেন। বুঝতে পারি না কবে তিনি বান্ধবী থেকে একটা শিশুর মতো হয়ে গেলেন। প্রায় দুই যুগ ধরে একা থাকা আমার আম্মুর জন্য আমার বড় মায়া লাগে। আমার মনে হয় আমি যা চাই তাই যদি সত্যি হতো তাহলে আমি উনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ করতাম। সব বেদনা মুছে দিতাম।

আমার প্রায়ই মনে হয় ইসস, আমার আব্বু বেঁচে থাকলে আমাদের পরিবারটা কতো হাসিখুশি আর সম্পুর্ণ পরিবার হতো। অর্থ, বিত্ত দরকার নেই। কিন্তু একটা ভালোবাসায় মাখা পরিবার হতো। আমার খুব ইচ্ছে করে খুব হাসিখুশি টাইপের পরিবার নিয়ে বাঁচতে।

আমার এক বান্ধবী তাঁর মাকে ধমক না দিয়ে কথা বলে না। আমি ফোনে ওর রুঢ় কথা শুনে অবাক হই। আমার এক বন্ধু কখনওই রাতে বাসায় খায় না। যতই তাঁর বাবা আর মা না খেয়ে অপেক্ষা করুক না কেন। ওর কাছে নাকি এই অপেক্ষা বাড়াবাড়ি লাগে। অথচ আমি ভাবি এই একটা স্মৃতি পাওয়ার জন্য তো আমি আমার জীবন বাজি লাগিয়ে দিতে পারি।

…………………………………….

একুয়া রেজিয়া (জন্ম: ২৬ নভেম্বর, ১৯৮৯) একজন বাঙালি কথা সাহিত্যিক। তাঁর প্রকৃত নাম মাহরীন ফেরদৌস। বিগত কয়েক বছরে তার রচিত গল্প ও উপন্যাসের মাধ্যমে একুয়া রাজিয়া স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের অজস্র পাঠকের মনে। তাঁর জন্ম টিকাটুলির ছিমছাম একটি বাসায়। বাবা মোঃ নুরুল হক সরকারী ব্যাংকের কর্মকর্তা, মা মারিয়াম মাহজাবীন হক গৃহিণী এবং একই সাথে লেখক। বর্তমানে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি, লেখক একটা ক্রিয়েটিভ ডিজিটাল ফার্মে কর্মরত আছেন। নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করার চেষ্টা করছেন। তবে সবকিছুর চেয়ে লেখালেখি করাই তাঁর জীবনের মূল সাধনা।

Write a Comment