নাবিকের সমুদ্রযাত্রাঃ নুনকি একটি তারার নাম

0

14

নাবিকের সমুদ্রযাত্রাঃ নুনকি একটি তারার নাম

  • 0
  • #বই রিভিউ
  • Author: Zahid Hasan
  • Share
‘জাহাজের স্টিয়ারিং ও ক্যাপ্টেন ঠিক থাকলে জাহাজ কিছু হয় না’—একজন ক্যাপ্টেনের এমন সাহসী উক্তিকে সম্বল করে লেখক ক্যাপ্টেন শামস উজ জামান শিক্ষানবিশ নাবিক থেকে শুরু করে বড় জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে সমুদ্র পরিভ্রমণ করেছেন। সুদূর ব্যাংকক থেকে আবিদজান, আবিদজান থেকে ওডেনস, ওডেনস থেকে কলম্বো এবং কলম্বো থেকে কলকাতা। এক কথায় বলা চলে সমুদ্র, জাহাজ ও নাবিক-জীবনের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকথাধর্মী বইটি।

 

গ্রন্থটির নামকরণেও একটা নাটকীয়তা লক্ষ করা যায়। স্যাজিটারিয়াস নক্ষত্রমণ্ডলে দ্বিতীয় উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটির নাম নুনকি। সূর্যের চেয়েও পাঁচগুণ বড় এবং পৃথিবী থেকে ২২৮ আলোকবর্ষ দূরে। এই তারাটি খালি চোখে দেখা কিছুটা কষ্টকর। তবে নাবিকের বাইনোকুলার অথবা সেক্সট্যান্টের টেলিস্কোপে সূর্য ওঠা-ডোবার খানিক আগে-পরেই তারাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চান্ডিয়ান এক্সপ্রেশন : ‘দি এডিক্ট অব দি সি’ থেকে নেয়া ল্যাটিন ভাষায় ‘নুনকি’ শব্দের অর্থ— বিস্তৃত সমুদ্র। তবে লেখক সম্ভবত নুনকি তারাটির নামের সঙ্গেই মিলিয়ে বইটির নাম দিয়েছেন নুনকি একটি তারার নাম’
BUY NOW
নাবিক-জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিকথাধর্মী বই বাংলা ভাষায় খুব বেশি লেখা হয়নি। ইংরেজিতে ‘মিউটিনি অন দি বাউন্টি’ থেকে শুরু করে যেসব বই পড়েছি বা সিনেমা দেখেছি তার বেশির ভাগই ফিকশন। সাগর-জীবনের ওপর ‘ফাস্ট হ্যান্ড রিপোর্ট’ বাংলা সাহিত্যে কম লেখা হয়েছে। আগে থেকে এরকম উদ্যোগ থাকলে, আমরা হয়তো সেসব দিনের পালতোলা জাহাজের ক্যাপ্টেন কুক, ক্যাপ্টেন কলম্বাসদের সময়কার ভ্রমণবৃত্তান্ত পড়ে আজও পুলকিত হতাম। ষাট-এর দশকে লেখা খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের ‘কত ছবি কত গান’ বইটি পড়েছি। প্যাসেঞ্জার জাহাজে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা। যুদ্ধের কারণে সুয়েজ এড়িয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ভারত মহাসাগরে। জাহাজে পরিচয়, প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ। তীরবর্তী দেশগুলোর ইতিহাস, রাজনীতি বর্ণনা ইত্যাদি। লেখক শামস উজ জামানের লেখা ‘নুনকি একটি তারার নাম’ পড়ে সেসব কথা মনে পড়ছিল। তবে একজন নাবিকের দৃষ্টিকোণ থেকে সমুদ্রযাত্রার বর্ণনার সঙ্গে অন্য একজন যাত্রীর বর্ণনা আলাদা হবে সেটাই স্বাভাবিক।

 

বইটিতে লেখক তাঁর সমুদ্রচারী জীবনের গল্পগুলোকে তিনটি পর্বে ভাগ করে লিখেছেন। প্রথম পর্বে শিক্ষানবিশ জীবনের কথা দিয়ে শুরু করেছেন, দ্বিতীয় পর্বে এসে যুক্তরাজ্য, হংকং এবং আয়ারল্যান্ডে লেখাপড়ার কথা বলেছেন। তৃতীয় বা শেষ পর্বে ১৮০ দিনে সমুদ্রভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছেন। সহজ-সরল ভাষা, নির্লিপ্ত এসব বর্ণনায় উঠে এসেছে মেরিন জীবনের অনেক না জানা কথা, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে হিউমার, সেটা খুব স্বাভাবিকভাবে জীবনের গল্প-কথায় একাত্ম হয়ে গিয়েছে—মোটেই আরোপিত মনে হয় না। লেখার বর্ণনাতেও আছে চমত্কারিত্ব ও কৌতূহলবোধের পরিচয়। পাশাপাশি, লেখকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে এক বিদেশি মেয়ে নীলাঞ্জনার খুনসুটি, প্রেম-বিয়ে ও মন খারাপ করা পরিণতির কথা পড়তে পড়তে ‘নুনকি একটি তারার নাম’কে শুধু একজন নাবিকের স্মৃতিকথা বলে মনে হয় না, এতে উপন্যাসের স্বাদও পাওয়া যায়। প্রাক-কৈশোর জীবনে লেখকের বন্ধ—পাগলাটে স্বভাবের আবুজা, পরিণত বয়সে এসে সাইকোসিসের রোগী হয়ে যায়। করুণ এ উপ্যাখ্যানটি পড়ার সময় অনেক পাঠকেরই চোখে পানি চলে আসবে। এ বই থেকেই জেনেছি জাহাজের চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার সময় আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ার কথা। ওদিকে পাঠকমাত্রই ভাববেন দিনের পর দিন, আত্মীয়-পরিজন থেকে দূরে, রাশিরাশি পানি এবং ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে সমুদ্রে একজন নাবিক কী করে সময় কাটায়? এমন অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর আছে বইটিতে। পাটি বিছানো নিরালা সমুদ্রে একঝাঁক ডলফিন, জাহাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার ঘটনা পড়ার সময় মনে হয়েছে, আমি নিজেও বুঝি জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে সমুদ্রযাত্রায় সামিল হয়ে বাইনোকুলারে ডলফিন মাছের লাফালাফি দেখছি।

 

আরোও পড়তেপারেনঃ বিশ্ববরেণ্য কোটিপতিদের জীবন পাল্টে দেওয়া ৭টি বই

একটা নন-ফিকশন লেখাকে বই আকারে দাঁড় করাতে হলে দরকার ঘটনার উপজীব্য, সত্যনির্ভর তথ্য-উপাত্ত, চরিত্র বিশ্লেষণ এবং পরিবেশ আর পরিস্থিতি বর্ণনায় চমত্কারিত্ব। যার সবগুলোই এ বইটিতে বিদ্যমান। সুখপাঠ্য বইটি আমাদের সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে সন্দেহ নেই। বইটিতে একসঙ্গে উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি ও স্মৃতিচারণের স্বাদ আছে। আড়াইশ’ পৃষ্ঠার বইটি পাঠককে আকৃষ্ট করবে বলে আমার বিশ্বাস।
এই নিবন্ধটি পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিলো একটি জাতীয় দৈনিকে, মূল লিংক এখানে

Write a Comment