রকমারি হুমায়ূন

0

2

রকমারি হুমায়ূন

  • 0
  • #লেখক কুঞ্জ
  • Author: Zahid Hasan
  • Share

শুভ্র সকাল সকাল উঠেই ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে ল্যাপটপের সামনে বসে পড়লো। হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিবস চলে গেছে বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে। ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারটা আজ চেঞ্জ করতে হবে। হুমায়ূন আহমেদের ছবি আর কদিন ঝুলিয়ে রাখা যায়! তাকে নিয়ে যেসব অনুষ্ঠান হয় তার জন্মদিবসে ওগুলোও তো দুদিনের বেশি হয় না আর সে এতদিন ধরে তার ছবি প্রোফাইল পিকচার দিয়ে রেখেছে। যদিও সে হুমায়ূন আহমেদের বই একেবারেই পড়ে নি তবুও তার বন্ধুরা বলেছিল যে উনি নাকি অনেক কুল রাইটার ছিলেন। বই পড়ার অভ্যাস নেই শুভ্রর। বই পড়তে এতো বোরিং লাগে ওর। তার চেয়ে ল্যাপটপে বসে গেমস খেলতে আর ফ্রেন্ডসদের সাথে হ্যাংআউটেই বেশি মজা। হঠাৎ ল্যাপটপের পাশে একটা বই পড়ে থাকতে দেখলো শুভ্র। বইয়ের নাম “দারুচিনি দ্বীপ”,লেখক- হুমায়ূন আহমেদ। সে বুঝতে পারলো না এই বই কোথা থেকে আসলো। হয়তো ওর বড় বোন তিতলি এসে রেখে গেছে। গতকাল এসেছিল তিতলি ওদের বাসায়। তিতলি মূলত শুভ্রর সৎ বোন। কিন্তু কি এক অজানা কারণে সে শুভ্রকে ছোট ভাই হিসেবে অসম্ভব পছন্দ করে। কিন্তু শুভ্রর কিছুতে রা নেই। সে কারো প্রতি ভালবাসাও যেমন প্রকাশ করে না তেমনি রাগ হলেও তা অপ্রকাশিতই থাকে। অন্যসময় হলে শুভ্র এই বই ছুঁয়েও দেখত না,কিন্তু আজ কেন যেন পড়ে দেখতে ইচ্ছে করছে তার। বইটা আলগোছে হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলো শুভ্র। হাই পাওয়ারের চশমাটা নাকে ঠেলে দিলো কিছুটা…

……………………………

তিতলি আজ আবার এসেছে। গতকাল ওর ছোট ভাই শুভ্রর ঘরে লুকিয়ে দারুচিনি দ্বীপ বইটা রেখে এসেছিল। ভেবেছিল আজ আসলে শুভ্র ওকে নিশ্চয়ই দেখতে আসবে,কথা বলবে। কিন্তু না,আজও আসলো না শুভ্র। দরজার ফুটো দিয়ে বারবার দেখে তিতলি,বুয়া ছাড়া আর কেউ আসছে নাকি! দরজার নবটা ধরে আস্তে খোলার চেষ্টা করলো সে। যদিও জানে দরজাটা বাইরে দিয়ে লক করা থাকবে আর সবসময়ের মতো। তিতলি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। হলুদ পাঞ্জাবি পড়া একটা লোককে সে সেই কখন থেকে একমনে চা খেতে দেখছে। এক কাপ শেষ হলে আরেক কাপ,আরেক কাপ শেষ হলে আরো এক কাপ। চেহারা বোঝা যাচ্ছে না কারণ মাথা নিচু করে রেখেছে লোকটা। হঠাৎ ঘরের দরজাটা খুলে গেলো,শুভ্র কাঁদো কাঁদো চোখ নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিতলির ইচ্ছে করছে খুব যে ছোট ভাইয়ের কাছে গিয়ে তার হাত ধরে চোখের জল মুছে দিতে। কিন্তু সে পারবেনা,ভালোবাসা প্রকাশের সব ক্ষমতা খুব ছোটবেলাতেই তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। অনেক আগে আরও খুব ছোট্ট শুভ্র তার হাত ফসকে সমুদ্রের জলে পড়ে গিয়েছিল,বুদ্ধি প্রতিবন্ধি এই তিতলিই তাকে সাঁতার কেটে বাঁচিয়েছিল সেদিন। কিন্তু যে হাত ধরে শুভ্র সেদিন জীবন পেয়েছিল সেই হাত হারিয়ে ফেলেছিল শুভ্রকে কাছে পাওয়ার সবটুকু অধিকার। তিতলিকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল অটিজম সেন্টারে। সেখানে বসেই এতগুলো বছর সে তার আদরের ছোট ভাই শুভ্রকে খুঁজে নিয়েছে হুমায়ূন আহমেদের “শুভ্র”র মাঝে আর অপেক্ষা করেছে সেদিনের যেদিন আবার সে তার ভাইকে কাছে পাবে। শুভ্র কাঁদো কাঁদো চোখে তখনো দাঁড়িয়ে ছিল,তিতলি খুব সাবধানী ভঙ্গিতে পা ফেলে তার কাছে এগিয়ে যাচ্ছে। আলতো করে ছোট ভাইয়ের হাত ধরে তিতলি কেবল এটুকুই বলতে পারলো- এই শুভ্র এই…

নিচে মুদি দোকানে দাঁড়ানো হলুদ পাঞ্জাবি পড়া লোকটা জানালা দিয়ে ভাই-বোনের এই মিলনদৃশ্য দেখে চোখ মুছলো। মুদি দোকানি হা করে তাকিয়ে আছে অবশ্য। সে তো আর জানেনা তিতলিকে ৩ বছর ধরে রকমারি থেকে হুমায়ূন আহমেদের বই ডেলিভারি দিয়ে আসছে সে,ভাই শুভ্রর কতো গল্পই না করেছে তিতলি তার সাথে সময়ে-অসময়ে। ভাই-বোনের এই গল্পে পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকাতেই হোক এই সুখটুকুতে ভাগ বসানোর আর তো কেউ নেই।

……………………………………………

Write a Comment