শুদ্ধ রিভিউ – পাঠক সমালোচকের সততা!

0

12

শুদ্ধ রিভিউ – পাঠক সমালোচকের সততা!

  • 0
  • #অন্যান্য #বই রিভিউ
  • Author: Zahid Hasan
  • Share
আন্তর্জালের প্রসারিত ধারায় পাঠক কাগজ পড়ে কম। লেখাপড়ার এহেন সহজলভ্যতা ও উন্নয়নে সামগ্রিক অগ্রযাত্রা যেমন প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি মানসম্মত শিক্ষা ও চেতনায় সন্দেহ থেকে যায়। দিন শেষে কি দেখছি, কতটা শিখছি সেটা বিশাল এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে আসে চোখের সামনে। বইমেলা হচ্ছে, বই বাড়ছে। পাঠকও বাড়ছে। আশার কথার সাথে সাথে কিছু হতাশা হল শেখার জন্য যে বই তা থেকে কতটা জানতে পারছি, শিখতে পারছি!
 পড়া আর জানার পরে যে বিষয় থাকে তা হল শিক্ষা। শিক্ষার ক্ষেত্রটা খুব বেশি পরিষ্কার হয় তখন যখন ক্ষেত্র নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হয়, ভুলগুলো নিয়ে সমালোচনা হয়। এতে লেখক ও পাঠক দুই পক্ষই শিক্ষা চেতনায় নিজেকে শানিত করতে পারে। সমৃদ্ধ হতে পারে। কিন্তু বর্তমান ভেসে বেড়ানো সমালোচনায় সেগুলোর দেখা মেলে যথাকিঞ্চিৎ। এহেন সমালোচনা কখনো নিন্দার আকার ধারণ করে সৃষ্টিকে অপমানিত করে। আবার অহেতুক প্রশংসাও শিক্ষাকে ছিটকে ফেলে, জানার পথকে সংকির্ণ করে। তাই সমালোচকদের হতে হয় স্পষ্ট ও দীপ্ত। কালে কালে বহু গুণী লেখকগণও সাহিত্য সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছেন। নির্মোহ সমালোচক হয়েছেন, দোষ গুন নিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর আলোচনা করেছেন।
 বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথের পাঁচালী‘ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা রিভিউ লিখেছিলেন। জীবনের শেষ বয়সে বিভূতিবাবু পত্রমারফৎ রবিঠাকুরকে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন তার বইটি নিয়ে কিছু লেখেন। অর্থাৎ সমালোচনা। পরে স্থূল সমালোচনার সাথে চমৎকার প্রশংসাসহ পরিচয় পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো সেই রিভিউ।
 পথের পাঁচালী’র আখ্যানটি অত্যান্ত দেশি। কিন্তু কাছের জিনিসেরও অনেক পরিচয় বাকী থাকে। যেখানে আজন্মকাল আছি, সেখানেও সব মানুষ সব জায়গায় প্রবেশ ঘটেনা। ‘পথের পাঁচালী‘ যে বাংলা পাড়া-গায়ের কথা সেও অজানা রাস্তায় নতুন করে দেখতে হয়। লেখার গুণ এই-যে নতুন জিনিস ঝাঁপসা হয়নি। মনে-হয় খুব খাঁটি ও উচুদরের কথায় মন ভোলানোর জন্যে সস্তা দরের রাঙতার সাঁচ পরাবার চেষ্টা নেই। বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্যের জোরে। এই বইখানাতে পেয়েছি যথার্থ গল্পের স্বাদ। এর থেকে শিক্ষা হয়নি কিছুই, দেখা হয়েছে অনেক যা পুর্বে এমন করে দেখিনি। এইগল্পে গাছ-পালা, পথ-ঘাট, মেয়ে-পুরুষ, সুখ-দুঃখ সমস্তকে আমাদের আধুনিক অভিজ্ঞতার প্রাত্যহিক পরিবেষ্টনের থেকে দূরে প্রক্ষিপ্ত করে দেখানো হয়েছে। সাহিত্যে একটা নতুন জিনিস পাওয়া গেল, অথচ পুরাতন পরিচিত জিনিসের মত সে সুস্পষ্ট।
 বুঝতে পারা যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বই পাঠাবার পরেও তার অসাধারণ সৃষ্টি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি স্থূল সমালোচনা করেছেন।
 সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন ধারাবাহিকভাবে ‘পালামৌ লিখছিলেন হঠাৎ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওনাকে চিঠি লিখে বসলেন। চিঠিটি খুব গভীরভাবে নেড়ে চেড়ে দেখলেন, হ্যাঁ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের চিঠি! পড়ার পরে সঞ্জীবচন্দ্র দুটো বিষয় ভেবেছিলেন, এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার লেখা পড়েন। এবং শুধু আনন্দ নিতে পড়েন না বরং তিনি তার বিস্তীর্ণ লেখালেখির ফাঁকে ‘পালামৌ’ পড়ার সময়ও বিশ্লেষণ করেই পড়েছেন এবং পরে লেখাটির সমালোচনা করেছেন। সঞ্জীবচন্দ্র তারপরে আর লেখাটি থামাননি। রবীন্দ্রনাথ পরে আবারও চিঠি দিয়েছেন, সঞ্জীব তাও শোনেননি। এরপরে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেও চিঠি দিয়েছিলেন ভাই সঞ্জীবের পালামৌ সম্পর্কে। তাতেও কাজ হয়নি, অগত্যা কী আর করার। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ‘পালামৌ’ উপন্যাসের প্রতি পর্বের একটা একটা সমালোচনা বা রিভিউ ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় প্রকাশ করতে শুরু করেন। তবে কোথাও তিনি ব্যক্তি সঞ্জীবচন্দ্রের সমালোচনা করেননি বরং প্রশংসা করেছিলেন।
 সঞ্জীবচন্দ্রকে তখনো খুব বেশি পাঠক চিনত না। কিন্তু সেই সমালোচনার পরে তার ঈর্ষনীয় লেখনশৈলী নিয়ে মন্তব্য করেছেন ওই সময়কার বাংলা সাহিত্যের দিকপালগণ।
 তখনো পুরোদস্তুর লেখক হয়ে ওঠেননি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তবে তার কবিতায় ধার ছিল, সাহিত্য পাড়ায় তার যে কিঞ্চিৎ পদচারনা শুরু হয়েছে তা বেশ প্রশংসিত ছিল। আনন্দ পত্রিকার মালিকের ছেলে ডেকে বললেন, সাহিত্য সমালোচনা করতে। কঠিন বিষয়, তবে সুনীল রাজি হয়েছিলেন কারণ তখনো তার নামডাক শুরু হয়নি। শুরু করলেন প্রতিষ্ঠিতি লেখকদের সাহিত্য সমালোচনা, কারও গল্পতো কারও কবিতার। দেখা গেল আনন্দতে লেখেন এমন এক লেখকের গল্পের পরের সপ্তাহেই সুনীলের সমালোচনা ছেপেছে আনন্দ পত্রিকা। প্রতিষ্ঠিত ওই লেখক পরে হুমকি দিলেন আনন্দ পত্রিকায় তিনি আর লিখবেনইনা। কোথাকার এক পুঁচকে ছেলে তার লেখার ভুল ধরছে। সুনীল মনে মনে হাসেন। কারণ তিনি বুঝতে পারেন নিজের লেখা ধার হচ্ছে, ওই লেখক তার সমালোচনার উত্তর দেয়নি, বরং রাগ হয়েছে! অর্থাৎ তিনি তার ভুল বুঝতে পেরেছেন।
 আবার একজন লেখক সুনীলের বন্ধু মহলে বলেছেন, ঐ বাঙালের হাত পচে যাবে। কুষ্ঠ রোগ হবে। সুনীল তখনও খেয়াল করলেন তার সমালোচনার যৌক্তিক উত্তর নেই। এসময়য়ে তিনি একটা খিদে অনুভব করলেন, নিজেকে শাণ দেবার খিদে। নিজের লেখার অনাহূত কোন ভুল না আসে; লোকে তার লেখালেখি নিয়ে সমালোচনার সুযোগ না পায়। সুনীলের লেখা যে তার পরেও সমালোচিত হয়নি তা নয়, হয়েছে। কিন্তু নিজে যেভাবে ক্ষুরধার সমালোচনা করেছেন তেমন সুযোগ ছিল না। পেশাদার লেখক হবার পরে নিজেকে ছাড়িয়েছেন বারে বারে।
 একজন লেখক যখন লেখেন তখন নিজের সেরা দিয়ে লেখার চেষ্টা করেন। ঠিক ওই মুহূর্তে সেটা তার নিজের কাছে সেরা লেখা বলে বিবেচিত হয়। বলা চলে, অনেকটা নিশ্চিত হয়েই তিনি ছাপার জন্য প্রেসে পাঠান। লেখালেখি শুরু করাটা সাহসের ব্যাপার, ধৈর্য ও একটা বিষয় আছে। যিনি সত্যিকারের লেখক তাকে অনেক পড়তে হয়। যত বেশি পড়েন লেখায় তত বেশি ধার হয়। অনেকে হয়ত তরতর করে লিখে যেতে পারেন, অনেকে আবার বছরের পরে বছর ধরে একটা উপন্যাস শেষ করেন। এরপরে প্রকাশিত লেখা নিয়ে কাটাছেড়া হয়। এটা অবশ্য অন্যায় কিছুনা, পাঠক আপন মনে প্রিয় লেখকের লেখা নিয়ে মতামত জানাবেন সেটাই স্বাভাবিক। বরং অস্বাভাবিক হল মতামত না জানানো! মতামতের পন্থা আলাদা হতে পারে, এই ধরুন অনেকে বিষদ রিভিউ লেখেন আবার অনেকে প্রিয় বন্ধুর কানে কানে বলেন, ‘দোস্ত, অমুক লেখকের লেখা পড়ছ! জোস লেখেন…’ দিন শেষে কানে কানে ভেসে ভাল লেখাগুলো আলো ছড়ায়, আর যেগুলো আসলে লেখা হয়ে ওঠেনি সেগুলো ডুবে যায়।
 বিষদ রিভিউ বা সাহিত্য সমালোচনা করতে হলে যে আপনাকে দারুণ লেখার ক্ষমতা থাকতে হবে অথবা সাহিত্যিক হতে হবে তা নয়! বরং বই আলোচনার জন্যেও কিছু নিয়ম রয়েছে, মোটামুটি সেগুলো রপ্ত করলেই চলে। যেমন যেমন ধরুন কুইন্টাস হোরেসিয়াস ফ্ল্যাককাস। প্রায় একুশ’শ বছর আগে জন্ম নেওয়া হোরেস ছিলেন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমালোচনায় তিনি ছিলেন তৎকালীন সাহিত্যের প্রাণ পুরুষ। তিনি বলেছেন,
সমালোচককে হতে হবে নিরপেক্ষ ও সৎ। সমালোচক অবশ্যই সত্য ও মিথ্যের প্রভেদ লেখককে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হবেন। অহেতুক নিন্দা ও স্তুতি শিষ্ট সমালোচনা গ্রহনীয় নয়। লেখককে সত্য সন্ধানে সহায়তা করতে পারেন, এমন পণ্ডিত ও নিষ্ঠাবান সমালোচকই হোরেসের প্রত্যাশা।
 এখানে খেয়াল করলে বোঝা যায়, সমালোচক শুধু পাঠকের জন্য নয় বরং তিনি লেখকের জন্য বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। তার লেখার মাঝে লেখকের দুর্বলতাগুলো যেন লেখকের উদ্দেশ্যে হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।
 হোরেস নিজেকে সমালোচকের ভূমিকায় উপস্থাপন করে বলেছেন,- ‘আমি শান পাথরের ভূমিকা পালন করবো। যা নিজে কাটতে পারেনা, কিন্তু অস্ত্রকে ধারালো করতে পারে ঠিকই। যদিও আমি নিজে কিছু লিখি না।
হোরেসের মতে সমালোচক শান পাথরের মত। পাথর যেমন নিজে কাটতে পারেনা কিন্তু কাটার অস্ত্রকে ধারালো করতে পারে; তেমনি সমালোচক কবিকে সার্থকতা অর্জনে সহায়তা করবেন, কবির কবিত্বকে শানিত করবেন। সমালোচক কবির কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেবে, উপকরণের উৎস বলে দেবে, কবির কবিত্ব শক্তিকে সমৃদ্ধ করার উপায় বলে দেবে। কবির কোন কাজটি প্রথম করনীয় তা বলে দেবে। কোন পথে চললে কবি সঠিক লক্ষ্যে পৌছতে পারবেন, ইত্যাদি।
 উপরক্ত সব আলোচনা থেকে একজন সমালোচক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, সততা ও নিষ্ঠার সাথে ছড়িয়ে দিতেও পারেন। সমালোচকের মৌলিক চোখে লেখার যে দুর্বলতা বইয়ের মূল বার্তাকে নষ্ট করে না তার অনর্থক আলোচনা নতুন পাঠককে বই থেকে ছিটকে ফেলতে পারে। খেয়াল রাখা দরকার, দুর্বলতা থাকার পরেও লেখকের উদ্দেশ্যকে প্রকাশে কিঞ্চিৎ অনিহা সমালোচকের সততা নিয়ে যেন প্রশ্ন না তোলে। আবার মূল প্রাত্যহিক অর্থও বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ নষ্ট করতে পারে, সুতারং সমালোচক যেন সততা ও সাবধানতার পরীক্ষণপূর্বক মন্তব্য প্রকাশ করেন।

Write a Comment